দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে সহায়তা দিতে ১,০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ঋণ ও অনুদান কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত এ কর্মসূচির আওতায় তরুণ উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পেতে পারেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ঋণের সুদহার হতে পারে ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধকারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় মোট ১,০০০ কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে প্রায় ৫ হাজার উদ্যোক্তাকে দেওয়া হতে পারে। প্রতিটি উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বাকি ৫০০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে বরাদ্দের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কর্মসূচির মোট আকার, ঋণের পরিমাণ ও অন্যান্য শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর প্রতিনিধিদলের বৈঠকের পর এ পরিকল্পনার কথা জানান এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন।
তিনি জানান, তরুণদের ব্যবসায়িক উদ্যোগকে অর্থায়নের আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মসূচিটির কাঠামো তৈরির কাজ করছেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে ২৮ বছরের কম বয়সী তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু নতুন স্টার্টআপ নয়, অন্তত এক মাস বা এক বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন—এমন তরুণ উদ্যোক্তারাও ঋণের আওতায় আসতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন উপজেলাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করতে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ বা তদবিরের মাধ্যমে সুবিধা না হারান, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত ঋণ কর্মসূচি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, মৎস্য, হস্তশিল্প, খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এ ঋণ বিতরণ করতে পারে। এর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ অর্থায়ন এবং প্রচলিত ব্যাংক ঋণের মধ্যকার যে অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে, তা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ঋণ পরিশোধের সঙ্গে অনুদানকে যুক্ত করা। যারা নিয়মিত ও সময়মতো ঋণ পরিশোধ করবেন, তাদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
এ অনুদানের অর্থ একবারে না দিয়ে কয়েক ধাপে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের একটি অংশ ব্যবহার করেও এ অনুদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।
এবিবির চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বলেন, বিপুলসংখ্যক তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা ও উদ্যোগ থাকলেও পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। প্রস্তাবিত কর্মসূচির মাধ্যমে এমন তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ৫ হাজার তরুণকে অর্থায়ন করা হলে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সফল হলেও দেশের উদ্যোক্তা খাতে নতুন একটি ধারা তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচিটি চূড়ান্ত হলে এটি দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের অর্থায়ন, জামানত ছাড়াই ঋণপ্রাপ্তি এবং সফল উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদানের সুযোগ—এই তিনটি সুবিধাকে একসঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।