দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের প্রথম বাজেটে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) শিক্ষা খাতে প্রায় ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪.৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। আগের বছরগুলোতে এ বরাদ্দ ১.৪ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষা খাতে এ বরাদ্দ গত অর্থবছরের তুলনায় ৫৬.৬ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি ২০৩০ সাল নাগাদ সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সত্যিকারের গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এর পূর্বশর্ত। এবারের বাজেটের মধ্যদিয়ে সরকার তার সে অভিপ্রায় বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। এ ধরনের পরিবারের পক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষা উপকরণ ক্রয় করা অনেকটা বিলাসিতার মতো। সরকার প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অভিজ্ঞতাকে আরো আনন্দময় করে তুলতে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও পাটের ব্যাগ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলতি বছরে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থীকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে, পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রমের বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের লক্ষ্যে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ আয়োজন করা হয়েছে। এটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। এ টুর্নামেন্টে প্রায় এক লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের একটি ঐকান্তিক প্রয়াস রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ক্রিড়া, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা। নতুন প্রজন্মের এ সম্পৃক্ততা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী সময়ে ক্ষয়প্রাপ্ত নৈতিকতা ও সামাজিক সম্পর্কের পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। এ লক্ষ্যে আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট চারটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চতুর্থ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন বই। এছাড়া, করিগরি শিক্ষা বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক জীবনধারার উপর ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘লার্নিং উয়িথ হ্যাপিনেস’ শীর্ষক দুটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। এই নতুন বিষয়গুলো প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে জীবনমুখী বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা সৃষ্টি করবে।
নতুন প্রজন্মকে জলবায়ু সুরক্ষায় সম্পৃক্ত করতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ (একটি শিশু, একটি গাছ) কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতি বর্ষায় একটি করে গাছের চারা রোপণ করবে, তার যত্ন নেবে এবং প্রকৃতি ও জলবায়ু সুরক্ষায় সম্পৃক্ত হবে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ অনুষ্ঠানের দিন এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আগামীতে পরিবেশ রক্ষায় অভাবনীয় সুফল বয়ে আনবে।
পাঠদান প্রক্রিয়াকে আরো বেশি আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী করতে দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও ইন্টার্যাক্টিভ পাঠদানে সম্পৃক্ত করার জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সাথে ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে দেশের সব স্কুল, কলেজ, পাবলিক লাইব্রেরি ও ক্যাফেগুলোতে সরকারি খরচে উচ্চগতির সুরক্ষিত ফ্রি ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক পর্যায়ক্রমে চালু করা হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান বা ম্যান্ডারিনের মধ্যে ভাষা নির্বাচনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে প্রবেশ, কর্মসংস্থান প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশের তরুণরা।
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশ গমন করে। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের অংশ হিসেবে ব্যাংক সলভেন্সির প্রমাণ অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যই একটি কষ্টসাধ্য বিষয়। এ সমস্যার সমাধানে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে গমনেচ্ছুক শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক সলভেন্সি বা আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস থেকে তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ তৈরি করতে প্রতিযোগিতামূলক ‘সিড ফান্ডিং’ ও ‘ইনোভেশন গ্রান্ট’ প্রদান শুরু হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা ও নতুন স্টার্টআপ তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সমমূলধনী ইক্যুইটি অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ নামে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে।
আমাদের মোট শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ মাদরাসা শিক্ষায় অন্তর্গত। মাদরাসা শিক্ষার মূল দ্বীনিশিক্ষা কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে এর সাথে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, ফ্রিল্যান্সিং ও কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তয়ায়িত হলে ভবিষ্যতে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রচলিত কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে মহান জাতীয় সংসদে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১৫০-এ উত্তীর্ণ করা হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের মননে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে প্রভাব রাখবে।
বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় সমস্যা। এ সংকট উত্তরণে সরকার মেধাবী ছাত্রীদের বৃত্তিসহ ডিগ্রি/অনার্স পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা দিয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা রাখা যায়। নারী শিক্ষাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদানের ইতিহাস বিএনপির জন্য নতুন নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইতোপূর্বে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি করার জন্য মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও বিশেষ উপবৃত্তির সুযোগ চালু করে। গ্রামীণ পর্যায়ে নারীদের শিক্ষার হার বৃদ্ধির জন্য এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
এছাড়াও, দুর্গম ও অনগ্রসর অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ঝড়েপরা রোধে চলমান মিড-ডে মিল কার্যক্রমকে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পার্বত্য অঞ্চল, হাওরাঞ্চল ও চরাঞ্চলসহ দুর্গম এলাকার শিশুদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ ভৌগোলিক শিক্ষা বাজেট ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। হাওরে স্পিডবোট/নৌকা পাঠশালা, পাহাড়ে ফ্রি আবাসিক হোস্টেল এবং শিক্ষকদের জন্য দুর্গম এলাকা ভাতা চালু করা হয়েছে। এর বাইরে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অ্যাসিস্টিভ ডিভাইস (হুইলচেয়ার, শ্রবণযন্ত্র, চশমা, ক্র্যাচ) বিতরণ করা হয়েছে।
সামগ্রিক বিবেচনায় সরকার শিক্ষা খাতে রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের জন্য আধুনিক পাঠদান প্রক্রিয়া, জীবনমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃজন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাসহ বহুমাত্রিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। গৃহীত এসব উদ্যোগের সুফল হয়তো তাৎক্ষণিক না পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর বৃহৎ পরিসরে আর্থ-সামাজিক প্রভাব থাকবে, যা দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে একান্ত অপরিহার্য।
লেখক : কলামিস্ট