বিডিশেয়ার ডেস্ক : এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়। ফল নিয়ে অসন্তোষ, সন্দেহ-সংশয় থাকলে শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে। আগে এ পুনর্নিরীক্ষণে প্রাপ্ত নম্বর যোগ-বিয়োগে ভুল আছে কি না, শুধুই তা দেখা হতো। এবার পুনরায় খাতা দেখা হবে- এমন ঘোষণায় এসএসসি ও সমমানের ফল পুনর্নিরীক্ষণে রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। ফলে এসব আবেদন নিয়ে খাতা পুনর্মূল্যায়নে হিমশিম খাচ্ছে বোর্ডগুলো।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্যমতে, গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পরদিন ১১ আগস্ট থেকে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন শুরু হয়। এ প্রক্রিয়া চলেছে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে চার লাখ দুই হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেছেন। শিক্ষার্থীদের অনেকে একাধিক খাতা চ্যালেঞ্জ বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনও করেছেন। এতে মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে।
যদিও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা ভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী সব খাতা পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিলেও এটি প্রায় অসম্ভব কাজ। স্বল্পসময়ে প্রায় ১৩ লাখ খাতা তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণে এবারও নামমাত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের আশায় খাতা চ্যালেঞ্জের বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করেছে, তারা মূলত ‘ফাঁদে’ পা দিয়েছে বলেও মনে করছেন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
শিক্ষার্থীদের ব্যয় প্রায় ২০ কোটি টাকা, ফি গ্রহণ নিয়ে ‘প্রশ্ন’
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এক বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে ফি ১৫০ টাকা। এবার মোট আবেদন জমা পড়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি। সেই হিসাবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৯ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার ৯০০ টাকা।
পুনর্নিরীক্ষণে কোনো ফি নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফরম পূরণের সময় পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন ও ফল তৈরি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপরও শিক্ষার্থীদের খাতা ঠিকঠাকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তখন যদি কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করতে চায়, তাহলে তাকে ফি দিতে হবে কেন? শুধু সে পুনর্নিরীক্ষণ চায়, এ আগ্রহ জানালেই তো বোর্ড পুনরায় খাতা দেখে তার ফল জানাতে বাধ্য।’
এ শিক্ষাবিদের সঙ্গে একমত রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া এক শিক্ষার্থীর মা। আরিফা জাহান হেনা নামের ওই অভিভাবক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা তো ফরম পূরণের সঙ্গে সব ফি দিয়েছি। তাহলে আবার কেন ফি দিতে হবে? তাছাড়া পুরো খাতাটা নাকি দেখাও হয় না। তারা যোগ বা বিয়োগ করতে ভুল করে; সেটা সংশোধনে আবার উল্টো আমাদের কাছ থেকেই টাকা নেন। এটা তো জুলুম।’
খাতা পুনর্নিরীক্ষণে বিগত ৪ বছরে কত আবেদন
২০২২ সালে এসএসসির ফল প্রকাশের পর দুই লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৪টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে প্রায় ৫ লাখ আবেদন জমা পড়েছিল। ২০২৫ সালে ৬ লাখ ২৩ হাজার খাতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
পুনর্নিরীক্ষণে কোন বছরে শিক্ষার্থীদের ব্যয় কত
আগে প্রতিটি খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ফি ছিল ১২৫ টাকা। সেই হিসাবে ২০২২ সালে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার ৭৫০ টাকা আয় করেছিল শিক্ষা বোর্ডগুলো।
২০২৩ সালে উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করতে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন ফি থেকে বোর্ডগুলোর আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা চ্যালেঞ্জের ফি বাড়িয়ে দেয় শিক্ষা বোর্ডগুলো। ওই বছর থেকে পুনর্নিরীক্ষণ ফি ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসাব ধরে ২০২৫ সালে পুনর্নিরীক্ষণ বাবদ শিক্ষার্থীদের ব্যয় এবং বোর্ডগুলোর আয় ছিল প্রায় ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
আবেদন লাখ লাখ, ফল পরিবর্তন খুবই অল্প শিক্ষার্থীর
প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়লেও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হয়। এতে বোর্ডের আয় বাড়ে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে পৌনে ৩ লাখ খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করা হলেও ফল পরিবর্তন হয় মাত্র ২ হাজার ৭৮৩ জনের। ২০২৩ সালে সাড়ে ৪ লাখ আবেদন জমা হলেও ফল পরিবর্তন হয়েছিল ১১ হাজার ৩৬২ জন শিক্ষার্থীর।