বিডিশেয়ার ডেস্ক :আগস্ট মাসে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এক মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ২৯৮ পয়েন্ট বা প্রায় ৫ শতাংশ। একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দরপতনের সঙ্গে বাজারে লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মাসের শুরুতে যেখানে দৈনিক লেনদেন ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল, মাসের শেষ কার্যদিবসে তা নেমে এসেছে ৪৭৭ কোটি টাকায়।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন মার্জিন ঋণনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ, কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসে আকস্মিক পরিদর্শন এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের অস্থিরতাও পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসের শুরুতে সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ৩১ আগস্ট মাসের শেষ কার্যদিবসে লেনদেন শেষে তা নেমে আসে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
বাজার মূলধন কমার অর্থ হলো, তালিকাভুক্ত শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজের বাজারদর কমে যাওয়ায় ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সম্পদের সম্মিলিত বাজারমূল্য কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর বাজারমূল্যে।
কমেছে সূচকও
আগস্টের শুরুতে ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্ট। ৩১ আগস্ট লেনদেন শেষে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে। ফলে এক মাসে সূচক কমেছে ২৯৮ পয়েন্ট। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ৫ শতাংশ।
তবে সূচকের পতনের চেয়েও বাজারের লেনদেনের সংকোচনকে বেশি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, দরপতনের সময় লেনদেনও কমে গেলে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি ও বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আগস্টের শুরুতে ডিএসইতে এক দিনে ১ হাজার ৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল। ৩১ আগস্ট তা কমে দাঁড়ায় ৪৭৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক লেনদেন কমেছে ৫৬৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৪ শতাংশ।
আস্থার সংকট
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সূচক ও বাজার মূলধন কমার পাশাপাশি লেনদেনের এমন সংকোচন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। সাধারণত দরপতনের সময় কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগ তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীরা যদি নতুন করে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী না হন, তাহলে বাজারে ক্রেতার সংকট তৈরি হয়।
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসই নিয়মিত কাজ করছে। কোনো ব্রোকারেজ হাউস থেকে যাতে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য কিছু ব্রোকারেজ হাউসে আকস্মিক পরিদর্শন করা হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, এসব পরিদর্শনকে অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে আতঙ্কিত হচ্ছেন। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পুঁজিবাজারের জন্য সহায়ক ছিল না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। আবার কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, এসব কারণে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফায় চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও লভ্যাংশ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারের দামে।
সামনে চ্যালেঞ্জ আস্থা ফেরানো
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু সূচক বাড়ানোর চেষ্টা করে পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতা কাটানো যাবে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এর জন্য নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করার পাশাপাশি বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
আগস্টের বাজারের চিত্র বলছে, পুঁজিবাজারে শুধু শেয়ারের দাম কমেনি, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমেছে। ফলে বাজারকে স্থিতিশীল করতে এখন দরকার আস্থা ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ।